
মহাবিশ্বে আমরা একা কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো দূরত্ব। মহাকাশ এত বিশাল যে সেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকলেও তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হওয়া খুব কঠিন। কোথাও প্রাণের জন্ম হয়েছে কি না, তা এক প্রশ্ন। আর সেই প্রাণের সঙ্গে আমাদের কখনো যোগাযোগ হবে কি না, তা সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন। দুটি বিষয়কে আমরা প্রায়ই এক করে দেখি, কিন্তু মহাবিশ্বের বাস্তবতা আমাদের আলাদা করে ভাবতে শেখায়।
পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। আলো এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় নেয় প্রায় ১.৩ সেকেন্ড। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছাতে লাগে প্রায় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। অর্থাৎ আমরা যখন সূর্যের দিকে তাকাই, তখন তাকে ঠিক সেই মুহূর্তের অবস্থায় দেখি না। দেখি কয়েক মিনিট আগের সূর্যকে। দূরের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান কয়েক বছর, আর দূরবর্তী ছায়াপথের ক্ষেত্রে কয়েক কোটি বা কয়েকশ কোটি বছরও হতে পারে।
এই বিষয়টি ভাবলে সময় সম্পর্কে আমাদের স্বাভাবিক ধারণা কিছুটা বদলে যায়। পৃথিবীতে আমরা কোনো মানুষকে সামনে দেখলে সাধারণত ধরে নিই, তাকে তার বর্তমান অবস্থাতেই দেখছি। কিন্তু মহাকাশে তাকালে সেই ধারণা আর খাটে না। আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময় নেয়। তাই দূরের কোনো ছায়াপথের দিকে তাকানো মানে তার অতীতের একটি ছবি দেখা। ছায়াপথটি এখন কেমন আছে, তা আমরা সরাসরি জানি না। এর মধ্যে তারার জন্ম হতে পারে, কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটতে পারে, বদলে যেতে পারে তার চারপাশের পরিবেশ।
মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এভাবেই তৈরি হয়। আমরা আলো, বিকিরণ এবং অন্যান্য সংকেত সংগ্রহ করি। সেগুলো বিশ্লেষণ করে বুঝতে চেষ্টা করি, বহু দূরে কী ঘটছে। অর্থাৎ মহাবিশ্বকে জানতে হলে আমাদের তার কাছাকাছি যেতে হয় না; তার কাছ থেকে আসা তথ্য পড়তে শিখতে হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিরও সীমা আছে। কোনো সংকেত এখনো আমাদের কাছে এসে না পৌঁছালে, শুধু কল্পনা করে তার প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব নয়।
এবার ভাবা যাক, পৃথিবী থেকে একশ আলোকবর্ষ দূরে কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আমরা যদি একটি বেতার সংকেত পাঠাই, তাহলে সেটি পৌঁছাতে একশ বছর লাগবে। তারা সংকেতটি বুঝে উত্তর পাঠালে সেই উত্তর পৃথিবীতে ফিরতে আরও একশ বছর লাগবে। অর্থাৎ একটি প্রশ্ন করে উত্তর পেতে আমাদের দুইশ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। আর দূরত্ব যদি এক হাজার আলোকবর্ষ হয়, তাহলে অপেক্ষার সময়ও বেড়ে যাবে বহুগুণ।
এখানে আলোর গতির সীমা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান অনুযায়ী, শূন্যস্থানে আলোর গতি প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। তথ্য বা সংকেত পাঠানোর মাধ্যমে এই সীমা অতিক্রম করার কোনো প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংকেত শনাক্ত করা বা পাঠানো সহজ হতে পারে, কিন্তু দূরত্বের কারণে যে সময় লাগবে, তা শুধু প্রযুক্তি উন্নত করলেই দূর করা যাবে না।
তবে যোগাযোগের সমস্যা শুধু দূরত্বের নয়। অন্য কোনো গ্রহে প্রাণ থাকলেও তারা আমাদের মতো বুদ্ধিমান কি না, প্রযুক্তি ব্যবহার করে কি না, কিংবা তাদের সভ্যতা কত দিন টিকে থাকে, তা আমরা জানি না। তাদের পাঠানো সংকেত শনাক্ত করার মতো যন্ত্র আমাদের আছে কি না, সেটিও প্রশ্ন। দুই সভ্যতার অস্তিত্ব একই সময়ে থাকা দরকার। একটি সভ্যতা যখন সংকেত পাঠাচ্ছে, অন্যটি তখনো টিকে আছে কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই।
ধরা যাক, কোনো গ্রহে দশ লাখ বছর আগে একটি প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা ছিল। তারা মহাকাশে সংকেত পাঠিয়েছিল। সেই সংকেত আজ পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে পারে, অথচ প্রেরক সভ্যতাটি বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পেতে পারি, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারব না। উল্টো ঘটনাও সম্ভব। কোনো সভ্যতা এখন আমাদের সংকেত শুনছে, কিন্তু তাদের উত্তর পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগেই মানবসভ্যতার চেহারা বদলে যেতে পারে। যোগাযোগের সুযোগ থাকা আর বাস্তবে কথোপকথন হওয়া যে এক বিষয় নয়, এই উদাহরণ তা বুঝিয়ে দেয়।
কিন্তু যোগাযোগ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? সাধারণত এক পক্ষের কাছ থেকে অন্য পক্ষের কাছে তথ্য পৌঁছানোকে যোগাযোগ বলি। অথচ মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এর চেয়ে অনেক পুরোনো। পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের বহু আগে নক্ষত্রের ভেতরে বিভিন্ন মৌল তৈরি হয়েছে। নক্ষত্রের বিবর্তন ও মৃত্যুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব মৌলের কিছু অংশ পরে নতুন নক্ষত্র, গ্রহ এবং পৃথিবী গঠনে যুক্ত হয়েছে। আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন ও লোহার মতো মৌলের ইতিহাসও মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
এসব নক্ষত্রের সঙ্গে আমাদের কোনো কথোপকথন হয়নি। তারা জানত না, একদিন তাদের তৈরি করা মৌল দিয়ে এমন প্রাণের জন্ম হবে, যারা নিজেদের উৎস খুঁজতে মহাকাশের দিকে তাকাবে। তবু সেই নক্ষত্রগুলোর ইতিহাস আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাসের অংশ। এখানে যোগাযোগ না থাকলেও সম্পর্ক আছে। কোনো কিছু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান না থাকলেও সেটি আমাদের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমার কাছে মহাবিশ্বকে বোঝার এই দিকটি বেশ আকর্ষণীয়। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়, আমরা যা জানি, বাস্তবতা শুধু তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তাহলে কোনো কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারলে সেটি কি আমাদের কাছে অর্থহীন? আমার মনে হয়, তা নয়। আমরা পৃথিবীর অনেক ঘটনা সম্পর্কে জানি না, তবু সেগুলো ঘটছে। একইভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত হলেও সেখানকার বাস্তবতা শুধু আমাদের অজ্ঞতার কারণে মুছে যায় না। তবে অজানা কিছু আছে বলেই সেখানে নির্দিষ্ট কোনো প্রাণ বা সভ্যতা আছে, এমন দাবিও করা যায় না। সম্ভাবনা আর প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে।
মহাবিশ্বের প্রসারণ এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। মহাবিশ্বের সব দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আলো একদিন আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণে কিছু অঞ্চল আমাদের থেকে এমনভাবে দূরে সরে যাচ্ছে যে সেখান থেকে এখন নির্গত আলো ভবিষ্যতেও আমাদের কাছে পৌঁছাতে নাও পারে। ফলে মহাবিশ্বের একটি অংশ আমাদের জন্য শুধু দূরের নয়, কার্যত যোগাযোগের নাগালের বাইরেও থাকতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে সেই অঞ্চল নেই; বরং সেখানে কী ঘটছে, তা জানার জন্য প্রকৃতি আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, তারও সীমা আছে।
এখানেই অস্তিত্ব ও জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। কোনো কিছু থাকা আর সে সম্পর্কে জানা এক বিষয় নয়। আবার জানা আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারাও এক নয়। আমরা মহাবিশ্বের কিছু অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারি, কিছু ঘটনা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারি, কিন্তু সবকিছুকে সরাসরি পরীক্ষা করতে পারি না। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের অনুসন্ধান থামিয়ে দেয় না। বরং কোন প্রশ্নের উত্তর প্রমাণ দিয়ে দেওয়া সম্ভব আর কোন প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, তা বুঝতে সাহায্য করে।
মানুষের অস্তিত্বের একটি অদ্ভুত দিক হলো, আমরা এমন এক মহাবিশ্বের অংশ, যার সামান্য অংশ সম্পর্কে মাত্র জানতে পেরেছি। পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আমরা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথের আলো বিশ্লেষণ করি। সেই আলো থেকে মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কে ধারণা তৈরি করি, অন্য কোথাও প্রাণ থাকতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা করি। কিন্তু যাদের খুঁজছি, তারা আদৌ আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নই। এই অনুসন্ধানের মধ্যে যেমন কৌতূহল আছে, তেমনি আছে অনিশ্চয়তা।
মহাবিশ্বের দূরত্ব তাই শুধু আমাদের আলাদা করে রাখে না; এটি আমাদের জ্ঞানের সীমাও বুঝিয়ে দেয়। যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হলেও অনুসন্ধানের পথ বন্ধ হয় না। আমরা সংকেত পাঠাতে পারি, দূরের গ্রহের বায়ুমণ্ডল পরীক্ষা করতে পারি, নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করতে পারি। এসবের মাধ্যমে অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে কোনো সংকেত না পাওয়াকে অন্য কোথাও প্রাণ নেই বলে ধরে নেওয়া যাবে না। আমরা হয়তো ভুল জায়গায় খুঁজছি, ভুল ধরনের সংকেতের অপেক্ষায় আছি, অথবা আমাদের অনুসন্ধানের সময় এখনো আসেনি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু মহাবিশ্বে আমরা একা কি না, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মহাবিশ্বের সম্পর্ক কতটা বিস্তৃত, আর সেই সম্পর্কের কতটুকু আমরা জানতে পারব। কোনো দূরবর্তী সভ্যতার সঙ্গে কখনো যোগাযোগ না হলেও আমরা মহাবিশ্বের অংশ হয়েই থাকব। আবার তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ পেলে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ধারণাও বদলে যেতে পারে।
মহাবিশ্ব হয়তো আমাদের জন্য কোনো বার্তা পাঠাচ্ছে না। আমরা বরং তার আলো, বিকিরণ এবং পরিবর্তনের মধ্যে তথ্য খুঁজছি। সেই তথ্যের কিছু অংশ বুঝতে পারছি, কিছু অংশ এখনো অজানা। আর এই সীমিত জ্ঞান নিয়েই আমরা এমন প্রশ্ন করছি, যার উত্তর পেতে কয়েক প্রজন্মের সময়ও লেগে যেতে পারে।